Navigation

দেয়ালের ওপারে এক টুকরো আকাশ


 শহরের এক কোলাহলপূর্ণ গলির শেষ প্রান্তে, জীর্ণ একটি বাড়ির ছোট্ট কামরায় বাস করত অর্ক। বাইরে থেকে দেখলে তাকে আর দশজন সাধারণ মানুষের মতোই মনে হতো, কিন্তু অর্কের পৃথিবী ছিল পুরোপুরি অন্ধকার। জন্ম থেকেই সে দৃষ্টিহীন। তবুও তার ক্যানভাসে ফুটে উঠতো প্রকৃতির অফুরন্ত রঙ, জীবনের ছোঁয়া আর মানুষের স্বপ্ন। তার আঙুলের জাদু ছিল অসাধারণ। স্পর্শের অনুভবে সে রঙ আর রূপ চিনতো, আর তার মন দিয়ে দেখতো পৃথিবীর সব সৌন্দর্য।

অর্কের ছোট্ট স্টুডিওতে প্রতিদিন দু’জন মানুষ আসতো। একজন বয়স্ক নারী, যিনি অর্কের জন্য খাবার নিয়ে আসতেন, আর একজন যুবক, নাম রিশাদ, যিনি অর্কের আঁকা ছবিগুলো শহরের নামকরা গ্যালারিতে পৌঁছে দিতেন। রিশাদ নিজে একজন উঠতি শিল্পী ছিল, কিন্তু অর্কের কাজে সে এক অন্যরকম শান্তি ও প্রেরণা পেতো। অর্কের ছবি বিক্রি হলে যে অর্থ আসতো, তার একটা অংশ অর্ক খাবারের জন্য রাখতো, আর বাকিটা জমিয়ে রাখতো একটি বিশেষ উদ্দেশ্যে।

একদিন রিশাদ এসে অর্ককে জানালো, শহরের সবচেয়ে বড় শিল্প প্রদর্শনীতে অর্কের একটি ছবি জায়গা পেয়েছে। রিশাদ খুব খুশি, কিন্তু অর্ক কিছুটা বিষণ্ণ। কারণ সে তো নিজের আঁকা ছবি দেখতে পারবে না। রিশাদ অর্ককে সান্ত্বনা দিয়ে বললো, "তোমার শিল্প তোমার চোখের চেয়েও অনেক বড়, অর্কদা। তুমি যা দেখছো, তা আমরা চোখ দিয়েও দেখতে পাই না।"

প্রদর্শনীর দিন রিশাদ অর্কের হাত ধরে নিয়ে গেল গ্যালারিতে। সেখানে প্রবেশ করতেই সবাই অর্ককে সম্মান জানালো। তার আঁকা একটি বিশাল ক্যানভাসে এক ঝলমলে নদীর পাশে গ্রাম্য মেলা, হাসিখুশি মানুষের ভিড় আর আকাশের নানান রঙের খেলা। সবার চোখে মুগ্ধতা। একজন প্রশ্ন করলো, "আপনি কীভাবে এত উজ্জ্বল রঙ ব্যবহার করেন? আপনার আঁকা এই ‘আকাশ’ যেন জীবন্ত!" অর্ক মৃদু হেসে বললো, "আমার দেখা পৃথিবী হয়তো অন্ধকার, কিন্তু আমার মন তো অন্ধকার নয়। আমি মানুষের হাসিতে, পাখির গানে, আর রিশাদের ভালোবাসায় আকাশের রঙ দেখতে পাই।"

এরপর অর্ক সকলের সামনে তার জমানো টাকা বের করলো। রিশাদ অবাক হয়ে প্রশ্ন করলো, "এসব কেন, অর্কদা?" অর্ক বললো, "আমার এই টাকাগুলো দিয়ে, এই গলির শেষ মাথার বস্তিতে যে ছোট্ট শিশুগুলো আছে, তাদের জন্য একটি খেলার মাঠ তৈরি করে দাও। ওরা যেন আমার মতো অন্ধকারে না থাকে, ওরা যেন দিনের আলো দেখতে পায়, দৌড়াতে পারে, হাসতে পারে। এটাই আমার দেখা ‘আকাশ’।"

অর্কের কথায় সবার চোখে পানি এসে গেল। একজন অন্ধ শিল্পী যে মানবিকতা ও স্বপ্নের আলো দিয়ে সকলের মন জয় করে নিলেন, তার শিল্প শুধুমাত্র ক্যানভাসে সীমাবদ্ধ ছিল না, তা ছড়িয়ে পড়েছিল সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। রিশাদ এবং উপস্থিত সবাই অর্কের এই স্বপ্ন পূরণে এগিয়ে আসার প্রতিশ্রুতি দিল। সেই দিন থেকে, অর্কের শিল্প শুধু চিত্রকলাই রইল না, তা হয়ে উঠলো মানবিকতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

Share
Banner

NewsNow.BD

Post A Comment:

0 comments: